বিবাহ বিচ্ছেদের যাদুর লক্ষণ ও করণীয়

বিবাহ বিচ্ছেদের যাদুর লক্ষণ ও করণীয়

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় হালাল হচ্ছে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ। অথচ আমাদের সমাজে প্রতিবছরই বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ছে। সমাজ বিশ্লেষকগণ এর বিভিন্ন কারণ তুলে ধরলেও, এর অন্যতম একটি সম্ভাব্য কারণ ও তার প্রতিকার অনেক সময় আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। আর সেই কারণটি হলো — বিচ্ছেদের যাদু

বিচ্ছেদের যাদু কী

বিচ্ছেদের যাদু হলো এমন এক ধরনের যাদু, যার মাধ্যমে বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসায়িক পার্টনার কিংবা বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ, বিচ্ছেদ, ঘৃণা ও রাগ সৃষ্টি করা হয়।

কুরআন মাজীদে সূরাতুল বাক্বারায় আল্লাহ তাআলা এ যাদু সম্পর্কে ইরশাদ করেন—

“তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত।”— সূরা আল-বাকারা, ১০২

বিবাহ বিচ্ছেদের যাদুর ভয়াবহতা বোঝার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদীস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

ইবলিস পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে; তার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলকে বিভিন্ন স্থানে পাঠায়। তাদের মধ্যে যে যত বড় ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে, সে-ই তার কাছে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী হয়। একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি; ইবলিস বলে, তুই তো (উল্লেখযোগ্য) কিছুই করিসনি। অবশেষে আরেকজন এসে বলে, আমি অমুকের ও তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ না ঘটানো পর্যন্ত তাদের পিছু ছাড়িনি। অতঃপর শয়তান তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে, তুই কতই না উত্তম কাজ করেছিস।

এই হাদীসের বর্ণনাকারী আ’মাশ (রহ) বলেন, আমার ধারণা তিনি বলেছিলেন, অতঃপর শয়তান তাকে জড়িয়ে ধরে। — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮১৩।

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো শয়তানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিতনা। তাই কোনো সংসারে অস্বাভাবিকভাবে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে সম্ভাব্য সব কারণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিচ্ছেদের যাদুর বিভিন্ন ধরন

বিচ্ছেদের যাদু শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বিভিন্ন ধরন হতে পারে। যেমন—

১. বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বিভেদ সৃষ্টি করা।

২. ভাই-বোনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।

৩. বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।

৪. ব্যবসায়িক পার্টনারদের মধ্যে বিভেদ ও সম্পর্কচ্ছেদ সৃষ্টি করা।

৫. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা।

এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারী যাদু অত্যন্ত ভয়াবহ এবং বহুল আলোচিত একটি বিষয়।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদের যাদুর লক্ষণ

১. হঠাৎ করে ভালোবাসার সম্পর্ক ঘৃণা ও বিদ্বেষে পরিণত হওয়া।
উল্লেখযোগ্য বা যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই একজন অপরজনকে সহ্য করতে না পারা।

২. অতিরিক্ত সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হওয়া।
একজন অপরজনের ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত সন্দেহ করতে থাকা, সামান্য বিষয়কেও বড় করে দেখা এবং সন্দেহের চোখে বিচার করা।

৩. একে অপরের সামান্য বিষয়ও অসহনীয় মনে হওয়া।
অন্যের স্বাভাবিক আচরণ, কথা কিংবা কাজও অস্বাভাবিকভাবে বিরক্তিকর বা অপছন্দনীয় মনে হওয়া

৪. অন্য সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করলেও পরস্পরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা।
একজন ব্যক্তি অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও নিজের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রূঢ় বা খারাপ আচরণ করা

৫. পরস্পরের সৌন্দর্য ও চেহারা অসুন্দর মনে হওয়া।
সুশ্রী হওয়া সত্ত্বেও একজনের কাছে অন্যজনের চেহারা বিশ্রী, কুৎসিত বা বীভৎস মনে হওয়া।

৬. পরস্পরের সংস্পর্শে অস্বাভাবিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া।
এমনকি একে অপরের সংস্পর্শে এলেই মাথাব্যথা বা অস্বস্তির মতো উপসর্গও দেখা দেওয়া।

৭. প্রতিপক্ষের প্রায় সব কাজই অপছন্দ হতে থাকা।
জীবনসঙ্গীর স্বাভাবিক কথা, কাজ, আচরণ কিংবা সিদ্ধান্তও অসহনীয় মনে হওয়া।

৮. একজনের উপস্থিতির স্থানও অপছন্দ হতে থাকা।
যেমন— স্বামী ঘরের বাইরে স্বাভাবিক ও প্রফুল্ল থাকলেও ঘরে প্রবেশ করার পর হঠাৎ অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া, অস্বস্তি তৈরি হওয়া কিংবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া।

কেন এমনটা হতে পারে

সূরা বাকারার ১০২ নং আয়াতাংশ — “তথাপি তারা তাদের থেকে এমন জিনিস শিক্ষা করত, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত” — এর তাফসীরে হাফেজ ইবনে কাছীর (রহ) বলেন, যাদুর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটার মূল কারণ হলো, যাদুর প্রভাবে স্বামী বা স্ত্রীর কাছে তার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর আকৃতি, আচরণ, বন্ধন, রাগ ইত্যাদি বিচ্ছেদ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্বাভাবিক বিষয়ও মারাত্মক খারাপ মনে হতে থাকে।

অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাস্তবে বড় কোনো সমস্যা না থাকলেও তাদের একজনের কাছে অপরজনের স্বাভাবিক আচরণ ও বৈশিষ্ট্য অস্বাভাবিকভাবে বিরক্তিকর বা ঘৃণিত মনে হয়।

প্রাথমিক করণীয়

উপরোক্ত ধরনের অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে প্রথমেই নিজেদের মধ্যে শান্তভাবে আলোচনা করা, বাস্তব ও পারিবারিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এবং যথাদ্রুত শরিয়তসম্মত রুকইয়াহ শুরু করা উচিত।

উল্লেখ্য যে, দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলেই সরাসরি যাদুর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি যাদুর সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও উচিত নয়।

বিশেষ অনুরোধ

বিবাহবিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই সমস্যার প্রকৃত কারণগুলো যাচাই করুন। যাদুর আশঙ্কা থাকলে শরিয়তসম্মত রুকইয়াহসহ বৈধ উপায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেখুন।

কারণ, একটি সংসার ভেঙে যাওয়ার আগে যতটা সম্ভব সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

error: Content is protected !!