যাদুর পরিচয়, প্রকার ও লক্ষণ

যাদুর পরিচয়, প্রকার ও লক্ষণ

যাদুর আরবি প্রতিশব্দ ‘সিহর’। এর আভিধানিক অর্থ— কোনো বস্তুকে তার স্বরূপ থেকে বিচ্যুত করা। যেমন: সুস্থতাকে রোগ-ব্যাধিতে পরিবর্তন করা।

  • যাদু হলো এমন একটি বিষয়, যার উৎস অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর। এর মাধ্যমে বাতিলকে হকের আকৃতি দেওয়া হয় এবং কোনো বস্তুকে এমন দৃষ্টিনন্দন রূপে উপস্থাপন করা হয়, যাতে লোকজন অবাক হয়ে যায়।
  • যাদু তথা সিহর হচ্ছে শয়তান ও যাদুকরের মধ্যকার এক ধরনের চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী একজন যাদুকর কিছু শিরক ও হারাম কাজে লিপ্ত হয় এবং এর বিনিময়ে শয়তান তাকে সহযোগিতা করে ও তার চাহিদা পূরণ করে।
  • যাদুকর যাদুর মাধ্যমে মানুষ হত্যা, রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি, সহবাসে অক্ষমতা সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো, দুই ব্যক্তির মাঝে প্রেম-ভালোবাসা তৈরি করা এবং পরস্পরের মধ্যে শত্রুতাও সৃষ্টি করে থাকে।

ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, সিহর হচ্ছে এমন বাঁধন (গিট), ফুঁক বা বাক্যাবলীর নাম, যা পড়া, লেখা বা ব্যবহারের ফলে যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির দেহ, মন বা মস্তিষ্ক প্রভাবিত হয়।

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, সিহর হচ্ছে যাবতীয় অশুভ আত্মার প্রতিক্রিয়ার সমন্বিত রূপ, যার মাধ্যমে মানবপ্রকৃতি প্রভাবিত হয়।

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি (রহ.) বলেন, সিহর হচ্ছে সেসব বিষয়, যার উৎস গোপন থাকে। অবাস্তব প্রতারণাকে তাতে প্রকাশ করা হয় এবং বাস্তবতাকে গোপন করা হয়।

যাদুর প্রকার

বহুল ব্যবহার ও প্রচলনের ভিত্তিতে যাদুকে মোটামুটি ১১টি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে—

১) বিচ্ছেদের যাদু
২) ভালোবাসার যাদু
৩) দৃষ্টিভ্রমের যাদু
৪) পাগলামির যাদু
৫) একাকিত্ব ও দুর্বলতার যাদু
৬) অদৃশ্য আওয়াজের যাদু
৭) অসুস্থতার যাদু
৮) সাদাস্রাবের যাদু
৯) বিবাহ বন্ধের যাদু
১০) সহবাসে অক্ষমতার যাদু
১১) পুরুষ বা নারীর বন্ধ্যাত্বের যাদু

যাদুর লক্ষণ

জিন, যাদু, বদনজর ইত্যাদি আধ্যাত্মিক সমস্যার লক্ষণগুলোকে আমরা তিন ভাগে ভাহ করতে পারি।

  • সজাগ অবস্থায় যে সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পায়
  • ঘুমন্ত অবস্থায় যে সমস্ত লক্ষণ প্রকাশ পায়
  • রুকইয়াহ করা হলে তার মধ্যে যে সব লক্ষণ প্রকাশ পায়

সজাগ ও ঘুমন্ত অবস্থার লক্ষণগুলোর কিছু আছে যা যাদুর ধরণভেদে প্রকাশ পায়। আর কিছু লক্ষণ আছে যা কমন। যেকোন প্রকার যাদু করা হলেই সচরাচর উক্ত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। যাদুর নির্দিস্ট ধরণের কারনে যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়; তা উক্ত প্রকার যাদুর আলোচনার স্থানে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এখানে সকল প্রকার যাদুর সজাগ ও ঘুমন্ত অবস্থার কমন লক্ষণগুলো উল্লেখ করা হচ্ছে।

সজাগ তথা স্বাভাবিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে একজন যাদুগ্রস্থ রোগীর মধ্যে যে সব লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে

৩। যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করা হলে তার মধ্যে যে সব লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে তার সার সংক্ষেপ—

রুকইয়াহ বা কুরআন তিলাওয়াত শোনার সময় যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে যা যাদুর উপস্থিতিকে নির্দেশ করে:
  • শারীরিক অস্থিরতা ও খিঁচুনি: তিলাওয়াতের সময় রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, শরীরে তীব্র খিঁচুনি বা ঝাকুনি হতে পারে। এছাড়া হাত-পা বা শরীরের পেশিতে অনৈচ্ছিক নড়াচড়া দেখা দিতে পারে।

  • আবেগীয় প্রতিক্রিয়া: রুকইয়াহ চলাকালীন অকারণে উচ্চস্বরে কান্না, চিৎকার বা অট্টহাসি হতে পারে। বিশেষ করে যাদুর আয়াতগুলো পড়ার সময় কান্নার বেগ বা অস্বস্তি অনেক বেড়ে যেতে পারে।

  • শ্বাসকষ্ট ও অস্থিরতা: তিলাওয়াত শোনার সময় বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করা, দম বন্ধ হয়ে আসা বা শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং তিলাওয়াত বন্ধ করার জন্য প্রচণ্ড ছটফট করা।

  • চোখ ও চেহারার পরিবর্তন: চোখের পলক দ্রুত পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা তিলাওয়াতের সময় চেহারা হঠাৎ কালো হয়ে যাওয়া।

  • পেটের সমস্যা ও বমি: পেটে বা পাকস্থলীতে গ্যাসের গোলার মতো কিছু নড়াচড়া করা, বমি বমি ভাব বা সরাসরি বমি হওয়া। অনেক সময় বমির মাধ্যমে যাদুর বিষক্রিয়া শরীর থেকে বের হয়ে আসে।

  • অস্বাভাবিক অনুভূতি: শরীরে প্রচণ্ড গরম বা অতিশয় ঠান্ডা অনুভব করা, হাত-পা ঝিঁঝিঁ ধরা বা অবশ ভাব তৈরি হওয়া।

  • জিনের উপস্থিতি ও কথা বলা: অনেক সময় যাদুর সাথে যুক্ত জিন রোগীর জিহ্বা ব্যবহার করে কথা বলতে শুরু করে, হুমকি দেয় অথবা রাকিকে তিলাওয়াত বন্ধ করতে বলে।

  • অস্থিরতা ও শ্বাসকষ্ট: “الضيق الشديد والضجر من القراءة” তিলাওয়াতের সময় প্রচণ্ড অস্থিরতা ও শ্বাসকষ্টের মতো সংকীর্ণতা অনুভব করা।
  • অঝোরে কান্না: “يجهش المريض بالبكاء ويتعجب المريض نفسه من هذا البكاء” রোগী অঝোরে কাঁদতে থাকে এবং সে নিজেই এই কান্নার কারণ বুঝতে না পেরে অবাক হয়।

  • ঘুমিয়ে পড়া: “الاستسلام للنوم” রুকইয়ার চলাকালীন রোগী অবচেতনভাবে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে।

  • পেটে ব্যথা ও বমি: “غثيان أو ألم فى البطن” রোগী পেটে তীব্র ব্যথা অনুভব করে এবং বমি বমি ভাব হয়।
  • ব্যঙ্গাত্মক আচরণ: “ينظر إلى الراقي بسخرية وربما ضحك المصاب دون إرادة منه” যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি রুকইয়াহকারীর দিকে তাচ্ছিল্যের সাথে তাকায় এবং অনেক সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও হেসে ওঠে।

  • শরীরের রঙ পরিবর্তন: “سواد الوجه، خصوصاً وقت الرقية” যাদুটি যদি ‘খাওয়ার যাদু’ হয়, তাহলে রুকইয়াহর সময় মুখমন্ডল কালো হয়ে যেতে পারে।

  • শরীরের ভেতরে নড়াচড়া: “يشعر المسحور وكأن شيئاً يتحرك بداخله” রোগী অনুভব করে যে তার শরীরের ভেতরে কোনো কিছু নড়াচড়া করছে।
  • শরীরে কাঁপুনি এবং প্রচণ্ড ঘাম: “ويصيبهم أحيانا عرق غزير وقشعريرة” রুকইয়াহর সময় অনেক যাদুগ্রস্থ রোগীদের প্রচণ্ড ঘাম হয় এবং শরীরে কাঁপুনি বা লোমহর্ষণ হয়।
  • শরীর এবং হাত-পায়ে কাঁপুনি: “رعشة في الجسم والأطراف” যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর রুকইয়াহ করা হলে তার শরীরে এবং হাত-পায়ে কাঁপুনি হতে পারে।

 

error: Content is protected !!