সিহরুর রাবত: যৌন অক্ষম বানানোর যাদু

সিহরুর রাবত তথা যৌন অক্ষম বানানোর যাদু

লজ্জা নয়; চিকিৎসা গ্রহণ করুন । বিচিত্র এ দুনিয়ার মধ্যেও আরেক অন্ধকার দুনিয়া রয়েছে—যাদুর দুনিয়া । ‘সিহরুর রাবত’ সেই গোপন দুনিয়ার বিশেষ এক ধরনের যাদু। যার প্রভাবে ছেলেদের ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশন’ আর মেয়েদের ‘হাইপোভারসন’ বা ‘এভারসন’ জাতীয় সমস্যা ঘটে। ছেলেদের ক্ষেত্রে এ প্রকারের যাদুর পারিভাষিক নাম—‘সিহরুর রাবত’। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ প্রকারের যাদুর পারিভাষিক নাম—‘সিহরুত তাসফিহ’।

পরিচয়

সিহরুর রাবত বা ‘ربط’ বা যৌন অক্ষম করার যাদু হলো এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন সুস্থ পুরুষকে তার স্ত্রীর সাথে সহবাসে বাধা দেওয়া হয়।

লক্ষণ

১. الأحكام المتعلقة بالسحر والسحرة কিতাবে ‘রাবত’ বা সহবাসে বাধা দেওয়ার যাদুর প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে—

أن يكونَ الزَّوجُ مربوطاً عن الجِمَاعِ، والمربوط أشْبَهُ بالعِنِّين؛ إلا أَنَّ الرَّبْطَ لَا يَسْتَمِرُّ طَوِيلًا

অনুবাদ: “স্বামীকে সহবাস থেকে বেঁধে ফেলা হয়; এই যাদুগ্রস্ত ব্যক্তি ‘ইন্নীন’ বা নপুংসকের মতো হয়ে যায়, তবে এই অবস্থা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পৃষ্ঠা ৩৩৫।

২. ড. আয়েজ আল-কারনী লিখিত عالم السحر কিতাবে রাবত বা নপুংসক বানানোর যাদুর প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে—

عقد الزوج عن زوجه (سحر ربط الزوج) : ويؤدي هذا النوع إلى سلب الرجل القدرة الجنسية على إتيان أهله

অনুবাদ: “স্বামীকে স্ত্রীর থেকে বেঁধে ফেলা; এই ধরণের যাদু একজন পুরুষকে তার স্ত্রীর সাথে যৌনমিলনের সক্ষমতা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে দেয়। পৃষ্ঠা ১০৭।

৩. أسرار السحر والسحرة গ্রন্থে এই যাদুর সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়েছে—

أن يعجز الرجل المستوي الخلقة غير المريض عن إتيان زوجته

অনুবাদ: সুস্থ এবং স্বাভাবিক শারীরিক গড়নের একজন পুরুষের (যাদুর প্রভাবে) তার স্ত্রীর কাছে যেতে বা সহবাস করতে অক্ষম হওয়া। পৃষ্ঠা ১০৫।

৪. المنقذ القرآني لإبطال السحر কিতাবে নববিবাহিত যুবকদের ওপর এই যাদুর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে—

وفجأة يجد نفسه عاجزاً عن الجماع… وهذا ما يُسمى بالربط أو عقد الزوج عن زوجته

অনুবাদ: “হঠাৎ করে নিজেকে সহবাসে অক্ষম আবিষ্কার করা… একেই যাদুর পরিভাষায় ‘রাবত’ বা স্ত্রীকে স্বামী থেকে বেঁধে রাখা বলা হয়। পৃষ্ঠা ১৩০।

এই ধরণের যাদুর ক্ষেত্রে রোগী অনেক সময় অন্যান্য নারীদের প্রতি সক্ষম থাকলেও নিজের স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন।

সিহরুত তাসফিহ

সিহরুর রাবতের নারী ভার্সনকেই সিহরুত তাসফিহ বলে। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, সিহরুত তাসফিহ হলো নারীদের জন্য করা এক ধরণের ‘রাবত’ (শারীরিক বন্ধন) বা যৌন মিলনে বাধা দেওয়ার যাদু। এই যাদুটি মূলত নারীদের ওপর প্রয়োগ করা হয়; যাতে তারা তাদের স্বামীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারে। এই যাদুর বিভিন্ন ধরণ রয়েছে

ড. আয়েজ আল-কারনী তাঁর ‘عالم السحر’ গ্রন্থের ১৪৩ ও ১৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘রাবত’ বা যৌন অক্ষমতা তৈরির যাদুর সাতটি প্রধান প্রকার বর্ণনা করেছেন। নিচে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়া হলো:
১. রাবতুল মান’ (ربط المنع – বাধা প্রদানের বন্ধন): এটি এমন এক প্রকারের যাদু যেখানে স্ত্রী সহবাসের সময় অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বামীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। অনেক সময় মিলনের সময় স্ত্রী অনিচ্ছাসত্ত্বেও পা দুটি এমনভাবে চেপে ধরে রাখে যে মিলন সম্ভব হয় না।
২. রাবতুল তাবাল্লুদ (ربط التبلد – অনুভূতিহীনতার বন্ধন): এই যাদুাতে যাদুর কাজে নিয়োজিত জ্বিনটি স্ত্রীর মস্তিষ্কের অনুভূতি কেন্দ্রে অবস্থান নেয়। ফলে স্বামী যখন তার সাথে মিলিত হতে চায়, জ্বিনটি স্ত্রীর শারীরিক অনুভূতি কেড়ে নেয়। এতে স্ত্রী কোনো প্রকার যৌন তৃপ্তি পায় না এবং স্বামীর আহ্বানে সাড়া দিতে পারে না।
৩. রাবতুল নাযিফ (ربط النزيف – রক্তক্ষরণের বন্ধন): স্বামী যখনই স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, তখনই স্ত্রীর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ (ইস্তেহাজা) শুরু হয়। ফলে সহবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় স্ত্রীর যৌনাঙ্গ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে পারে বা মিলনের সময় স্ত্রী তীব্র ব্যথা অনুভব করে।
মুহাম্মদ আল-সায়েম লিখিত ‘المنقذ القرآني لإبطال السحر কিতাবে “রাবতুল মারআহ” বা নারীর বন্ধন যাদুটি সম্পর্কে এভাবে উল্লেখ করেছেন—

ربط المرأة : ومعناه أن الساحر يعقد سحره لربط رحم المرأة بموعد الجماع .. فإذا أراد الزوج مجامعتها سال الدم خارج الفرج بكثرة

অনুবাদ: নারীর বন্ধন; এর অর্থ হলো যাদুকর মিলনের সময় নারীর জরায়ু বা গোপন অঙ্গ বেঁধে ফেলে… ফলে স্বামী মিলন করতে চাইলে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পৃষ্ঠা ১২২

সংযুক্তি, রক্তক্ষরণ হওয়াটা বাঁধার একটি ধরণ। সবার ক্ষেত্রে হুবহু এটি-ই না হয়ে অন্য কিছুও হতে পারে। যেমন কারো ক্ষেত্রে স্বামী সহবাসের জন্য কাছে আসলেই অতিরিক্ত সাদাস্রাব শুরু হয়ে যেতে পারে। যা সহবাসে বাঁধা তৈরি করে।

এই যাদুর প্রভাবে আক্রান্ত নারী মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও শারীরিকভাবে স্বামীর সাথে মিলিত হতে বাধাগ্রস্ত হন

৪. রাবতুল ইনসিদাদ (ربط الانسداد – রুদ্ধতার বন্ধন): স্বামী যখন স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে যায়, তখন সে স্ত্রীর যৌনাঙ্গের মুখে মাংসপিণ্ডের মতো একটি দুর্ভেদ্য দেওয়াল বা বাধা অনুভব করে। ফলে স্বামী কোনোভাবেই মিলন সম্পন্ন করতে পারে না।
৫. রাবতুল তাগউইর (ربط التغوير – ভ্রমাত্মক বন্ধন): কোনো ব্যক্তি যদি কুমারী মেয়ে বিয়ে করে, তবে মিলনের সময় যাদুর প্রভাবে স্বামীর কাছে মনে হয় যে তার স্ত্রী কুমারী নয় (অকুমারী বা তালাকপ্রাপ্তা নারীর মতো)। এতে স্বামী স্ত্রীর সতীত্ব নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে যাদুটি মূলত স্বামীর ওপর প্রভাব ফেলে। যাদু নষ্ট হলে পুনরায় সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।
৬. রাবতুল আজয (ربط العجز – অক্ষমতার বন্ধন): এতে স্বামী স্ত্রীর কাছে যেতে শারীরিক অক্ষমতা অনুভব করে। মিলনের সময় তার শরীরে অবশভাব বা ঝিঁঝিঁ ধরার মতো অনুভূতি হয়, বিশেষ করে হাত ও পায়ে। এছাড়া সে কোমর ও উরুতে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। যদি সে মিলন করতে সক্ষমও হয়, তবে কোনো প্রকার তৃপ্তি পায় না।
৭. রাবতুল তানাওয়ুব (الربط بالتناوب – পর্যায়ক্রমিক বন্ধন): এই যাদুটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর যৌথভাবে কাজ করে। যখন স্বামী শারীরিকভাবে সক্ষম থাকে, তখন স্ত্রী অসুস্থ বা অক্ষম হয়ে পড়ে; আবার স্ত্রী সুস্থ থাকলে স্বামী অক্ষম হয়ে যায় [১০০৫]।
এই যাদুগুলো স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটানোর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

আমার রোগীদের মধ্যে এ সংক্রান্ত দুটি কেস স্টাডি শেয়ার করছি ।

কেস স্টাডি — ১

রোগী একজন পুরুষ । যৌন সচেতন ও সুস্থ মানুষ। বিয়ে করে বাসর ঘরে গিয়ে আবিষ্কার করলেন যে, তিনি ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশন’ এ ভুগছেন। অথচ ইতিপূর্বে তিনি এ বিষয়ে দিব্যি সুস্থ ছিলেন।

কেস স্টাডি — ২

রোগী একজন মেয়ে। বিয়ে হয়েছে এক বছর প্লাস । অথচ এ এক বছরের মধ্যে শতবার চেষ্টা করেও তারা ঘনিষ্ঠ হতে পারেননি । নিজ আগ্রহেই ভিন্ন জেলায় অবস্থানকারী স্বামীকে একাধিকবার বাসায় ডেকে এনেছেন; কিন্তু ঘনিষ্ঠতার শেষ পর্যায়ে এসে অজানা কোনো কারণে তিনি নিজেই আবার বাধা প্রদান করেন। তখন স্বামী এ বিষয়ক কোনো আগ্রহ প্রকাশ করলে চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালাগালি শুরু করে দেন ।

দু’জন‌ রোগীই যৌন রোগ ও সাইকো-সেক্সুয়াল সমস্যা ভেবে যৌন বিশেষজ্ঞ এবং সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু কোনো উন্নতি নেই । আর হবেই বা কি করে! এরা তো আসলে শারীরিক কিংবা মানসিক কোনো রোগেই আক্রান্ত নয় । মূলত দু’জনই ‘সিহরুর রাবত’ এ আক্রান্ত।‌ যার একমাত্র চিকিৎসা রুক‌ইয়াহ আশ শার‌ইয়্যাহ ।

মানুষের পাশাপাশি আশিক জ্বীনও অনেক সময় এ ধরণের যাদু করে থাকে । যেমন উপরে বর্ণিত কেস দু’টিতেই আমাদের ডায়াগনোসিসে মনে হয়েছে যে, ১নম্বর কেসটিতে মানুষ কর্তৃক এ যাদু করা হয়েছে । আর ২নং কেসটিতে আশিক জ্বীন নিজেই এ যাদু করেছে । (অদৃশ্যের সঠিক জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্য) ।

আশিক জ্বীন সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত ধারণা পেতে “আশিক জ্বীনঃ সংক্ষেপে ধারণা ও লক্ষণ” এই আর্টিকেলটি পড়তে পারেন ।

error: Content is protected !!