যেসব সময় ও অবস্থায় জিনের আছর হওয়ার ঝুঁকি বেশি

যেসব সময় ও অবস্থায় জিনের আছর হওয়ার ঝুঁকি বেশি

মানুষের কিছু বিশেষ মানসিক ও আবেগীয় অবস্থা, কিছু বিশেষ সময় এবং নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশ ও আচরণ জিনের আছর বা শয়তানি প্রভাব বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জিন বা শয়তান তখন তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে থাকে। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. বিশেষ সময়সমূহ

সূর্যাস্ত বা মাগরিবের সময়

দিনের এই সন্ধিক্ষণটি জিনদের ছড়িয়ে পড়ার প্রধান সময়। হাদীস অনুযায়ী, সন্ধ্যার শুরুতে বা সূর্যাস্তের ঠিক পরপরই শয়তান ও জিনেরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই কারণেই এই সময়ে শিশুদের ঘরের বাইরে রাখা বা গবাদি পশু ছেড়ে রাখা জিনের আছরের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য হয়।

রাত ও রাতের অন্ধকার

রাতের অন্ধকারও শয়তানি শক্তির বিস্তারের জন্য অনুকূল সময়। সূর্যাস্তের পর থেকে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত জিন ও শয়তানরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। রাতের বেলা বিশেষ করে নির্জন স্থানে তাদের বিচরণ ও প্রভাব বেশি থাকে। যারা রাতে আল্লাহর যিকির ও ইবাদত বর্জন করে ঘুমিয়ে থাকে, তাদের ওপর শয়তান প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়।

২. মানুষের মানসিক ও আবেগীয় অবস্থা

জিন মানুষের কিছু বিশেষ মানসিক ও আবেগীয় অবস্থাকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। বিশেষভাবে চারটি বিশেষ অবস্থায় জিন সহজেই মানুষকে কাবু করতে পারে— প্রচণ্ড রাগ, তীব্র ভয়, গভীর শোক এবং অতিমাত্রায় আনন্দ।

তীব্র রাগ বা ক্রোধ

প্রচণ্ড রাগের মাথায় মানুষ যখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন শয়তান তার রক্তের প্রবাহে মিশে যায় এবং তাকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলে।

তীব্র ভয় বা আতঙ্ক

কোনো কারণে মানুষ যখন প্রচণ্ড ভয় পায় বা হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তখন জিনের আছর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গভীর শোক ও অতিমাত্রায় আনন্দ

গভীর শোকে মুহ্যমান থাকা কিংবা অতিরিক্ত আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার ফলে মানুষের মানসিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায়। প্রচণ্ড রাগ, অতিরিক্ত ভয়, গভীর শোক বা অতিমাত্রায় আনন্দের কারণে মানুষ যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং আল্লাহকে স্মরণ করতে ভুলে যায়, তখন এটি জিনের আছরের জন্য মোক্ষম সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

কামোত্তেজনা বা যৌন আবেগ

তীব্র কামোত্তেজনা বা যৌন লালসার সময় জিনেরা মানুষকে আক্রমণ করতে পছন্দ করে।

তীব্র গাফিলতি তথা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা

আল্লাহর স্মরণ বা যিকির থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকা, দ্বীন সম্পর্কে চরম উদাসীন হয়ে পড়া এবং দীর্ঘ সময় গাফেল অবস্থায় থাকা মানুষকে জিনের আছরের জন্য সহজ লক্ষ্যে পরিণত করে। এমন অবস্থায় শয়তান তার ওপর স্থায়ী সঙ্গী বা ‘করীন’ হিসেবে চেপে বসে এবং তার আধ্যাত্মিক সুরক্ষা থাকে না। 

কুপ্রবৃত্তি ও গুনাহে মগ্ন থাকা

পাপাচার, নফসের গোলামি এবং গুনাহের কাজে ডুবে থাকা জিনের আছরের জন্য সহজ শিকারে পরিণত করে। জিন বা শয়তানের আক্রমণকে সহজ করে দেয়। অশ্লীল পরিবেশে অবস্থান করা এবং বিভিন্ন গুনাহপূর্ণ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা মানুষের আধ্যাত্মিক সুরক্ষা দুর্বল করে দেয়, ফলে সে আক্রমণের জন্য অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

৩. অনুকূল পরিবেশ ও স্থান

অপবিত্র স্থানে অবস্থান

ময়লা-আবর্জনা, কবরস্থান বা বাথরুমে মাসনুন দোয়া ছাড়া প্রবেশ করা এবং সেখানে দীর্ঘ সময় কাটানো জিনের আছরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। কারণ এগুলো তাদের প্রিয় আবাসস্থল। দোয়া বা বিসমিল্লাহ ছাড়া বাথরুমে প্রবেশ করা অথবা অপবিত্র অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকাও জিনের জন্য মোক্ষম সময় হিসেবে কাজ করে।

নির্জনতা

দীর্ঘ সময় একা থাকা বা নির্জন স্থানে দোয়া ছাড়া যাতায়াত করা জিনের আছরের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

পাপাচার, প্রাণীর ছবি ও গান-বাজনার পরিবেশ

যেসব ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে অথবা নিয়মিত গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র চলে, সেখানে শয়তানের অবস্থান এবং আছর করা সহজ হয়। একইভাবে গান-বাজনা, অশ্লীল পরিবেশ এবং গুনাহপূর্ণ কর্মকাণ্ড মানুষের আধ্যাত্মিক সুরক্ষা দুর্বল করে দেয়।

৪. আচরণগত ও পরিস্থিতিগত কারণসমূহ

যিকির ও সুরক্ষামূলক আমল বর্জন

সকাল-সন্ধ্যার সুরক্ষামূলক যিকির, দোয়া এবং অন্যান্য মাসনুন আমল বর্জন করলে মানুষ অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং জিন বা শয়তানের জন্য আক্রমণ করা সহজ হয়ে যায়।

বিসমিল্লাহ ছাড়া প্রবেশ ও চলাফেরা

 ‘বিসমিল্লাহ’ না বলে বাথরুম,  অন্ধকার বা নির্জন স্থানে প্রবেশ করা জিনের আছরের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

হাই তোলার সময়

মানুষ যখন হাই তোলে এবং মুখ হাত দিয়ে না ঢাকে, তখন শয়তান বা জিন সরাসরি শরীরের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পায়।

জিনদের আবাসে ক্ষতি করা

কোনো গর্তে প্রস্রাব করা অথবা গরম পানি বা ভারী কিছু ছুঁড়ে মারার মাধ্যমে জিনের আবাসে অজান্তে ক্ষতি করাও জিনের আছরের একটি বড় কারণ হতে পারে।

পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টির সময় শয়তান অত্যন্ত সক্রিয় থাকে। পারিবারিক কলহ ও ঝগড়া-বিবাদের পরিবেশ জিনের আছর বা শয়তানি প্রভাব বিস্তারের জন্য অনুকূল সুযোগ সৃষ্টি করে।

error: Content is protected !!