হিজামা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং নববী চিকিৎসার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ । রাসুলুল্লাহ ﷺ কেবল হিজামার নির্দেশই দেননি, বরং হিজামার জন্য সুনির্দিষ্ট সময়ও নির্ধারণ করে গেছেন । চান্দ্রমাসের ১৭, ১৯ ও ২১ তারিখে হিজামা করার বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে — যা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানও সমর্থন করে । এই লেখায় হাদিসের দলিল এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে ।
হাদিসের দলিল
প্রথম হাদিস
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
مَنِ احْتَجَمَ لِسَبْعَ عَشْرَةَ، وَتِسْعَ عَشْرَةَ، وَإِحْدَى وَعِشْرِينَ كَانَ شِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ (আবু দাউদ, হা/৩৮৬১)
অর্থ — যে ব্যক্তি চান্দ্রমাসের সতেরো, উনিশ বা একুশ তারিখে হিজামা করবে, তা প্রতিটি রোগ থেকে তার জন্য আরোগ্য হবে।
দ্বিতীয় হাদিস
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত —
كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يَحْتَجِمُ فِي الأَخْدَعَيْنِ وَالْكَاهِلِ، وَكَانَ يَحْتَجِمُ لِسَبْعَ عَشْرَةَ وَتِسْعَ عَشْرَةَ وَإِحْدَى وَعِشْرِينَ (তিরমিজি, হা/২০৫১)
অর্থ — নবী ﷺ ঘাড়ের দুই পাশে এবং কাঁধের উপর হিজামা করতেন এবং তিনি সতেরো, উনিশ ও একুশ তারিখে হিজামা করতেন ।
তৃতীয় হাদিস
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত —
خَيْر يَوْم تَحْتَجِمُونَ فِيهِ سَبْعَ عَشْرَةَ، تِسْعَ عَشْرَةَ، و إِحْدَى وَعِشْرِينَ
(মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৩১৬)
অর্থ — নিশ্চয়ই তোমরা যেসব দিনে হিজামা করো তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো সতেরো, উনিশ ও একুশ তারিখ ।
ইমামদের বক্তব্য
বিখ্যাত ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ তাঁর অমর গ্রন্থ ‘যাদুল মাআদ’-এ এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন । তিনি বলেন —
الحِجَامَةُ في النِّصفِ وما بعده أنفع من الحجامة في أوله وآخره
(যাদুল মাআদ, ৪/৫৮)
অর্থ — মাসের মাঝামাঝি এবং তার পরে হিজামা করা মাসের শুরু ও শেষে করার চেয়ে অধিক উপকারী ।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন — মাসের শুরুতে রক্ত যথেষ্ট সক্রিয় থাকে না, পূর্ণিমার দিকে (১৪-১৫ তারিখ) রক্ত সর্বোচ্চ উত্তেজিত হয় এবং ১৭ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে রক্ত সবচেয়ে পরিপক্ক ও বের করার উপযুক্ত অবস্থায় থাকে ।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
নবীজি ﷺ যে নির্দেশনা চৌদ্দশত বছর আগে দিয়েছেন, আধুনিক বিজ্ঞান আজ ধাপে ধাপে তার সত্যতা প্রমাণ করে চলেছে ।
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ও মানবদেহের তরল
পৃথিবীর সমুদ্রে যেমন চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের কারণে জোয়ার-ভাটা হয়, মানবদেহের তরল পদার্থেও একই নীতি কার্যকর হয় — কারণ মানবদেহের প্রায় ৭০% তরল পদার্থ । পূর্ণিমার দিন (১৪-১৫ তারিখ) চাঁদের আকর্ষণ সর্বোচ্চ থাকে, ফলে শরীরের রক্ত ও তরল উপরের দিকে বেশি টানা পড়ে । দূষিত রক্তকণা ও বিষাক্ত উপাদানগুলো তখনো ত্বকের কাছাকাছি স্তরে স্থির হয়ে থাকে — ফলে সুস্থ রক্ত নষ্ট না করে অত্যন্ত সহজে শরীর থেকে মৃত কোষ ও টক্সিন বের করে আনা সম্ভব হয় বং চিকিৎসার ফলাফল তুলনামূলক দ্রুত পাওয়া যায় ।
পূর্ণিমার পর ১৭ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে এই তরল পদার্থগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও কৈশিক নালিতে (capillaries) সঞ্চিত থাকে — যা হিজামার জন্য সর্বোত্তম অবস্থা তৈরি করে ।
উত্তম বার — সোম, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার
তারিখের পাশাপাশি হিজামার জন্য বারও নির্ধারিত আছে । আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত —
كَانَ يَحْتَجِمُ فِي الأَخْدَعَيْنِ وَالْكَاهِلِ وَكَانَ يَحْتَجِمُ يَوْمَ الاثْنَيْنِ وَالثُّلاَثَاءِ وَالْخَمِيسِ
(ইবনে মাজাহ, হা/৩৪৮৭)
অর্থ — তিনি ঘাড়ের দুই পাশে ও কাঁধে হিজামা করতেন এবং সোমবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবারে হিজামা করতেন ।
সুতরাং সবচেয়ে উত্তম হলো — চান্দ্রমাসের ১৭, ১৯ বা ২১ তারিখে সোম, মঙ্গল বা বৃহস্পতিবার পড়লে সেদিন হিজামা করা ।
সারসংক্ষেপ ও আমলের দিকনির্দেশনা
হিজামার জন্য চান্দ্রমাসের ১৭, ১৯ ও ২১ তারিখ উত্তম হওয়ার বিষয়টি একাধিক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমসহ বড় বড় আলেমদের দ্বারা স্বীকৃত এবং চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ও রক্তের গতিশীলতার বৈজ্ঞানিক নীতি দ্বারা সমর্থিত ।
তাই হিজামা করার আগে চান্দ্রমাসের তারিখ গণনা করুন এবং যথাসম্ভব ১৭, ১৯ বা ২১ তারিখে করার চেষ্টা করুন — বিশেষত সোম, মঙ্গল বা বৃহস্পতিবারে পড়লে সেদিন করা সর্বোত্তম ।
আল্লাহ আমাদের নববী চিকিৎসার সুন্নাতগুলো সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন — আমিন ।
— মুফতী মুহাম্মাদ আল-আমীন | পরিচালক, রুকইয়াহ একাডেমি, ঢাকা